- লস্ট মডেস্টি
ভাইয়া ও আপুরা, কেমন আছো তোমরা? অনেকদিন পর তোমাদের সাথে কথা হচ্ছে। আশা করি আগের দু’টি পর্বের বিষয়গুলো নিয়ে একটু হলেও ভাবছো এবং নিজের জীবনে প্রয়োগ করার চেষ্টা করছো।[১] আজ আমরা কথা বলব এমন একটা জায়গা নিয়ে, যেখানে আমাদের সবার ‘আসল রূপ’ প্রকাশ পায়। সেটা হলো আমাদের ‘ঘর’ বা ‘পরিবার’।
বাইরের বন্ধুদের সাথে আমরা কত হাসিখুশি থাকি, তাই না? কিন্তু বাসায় ফিরলেই কেন জানি মেজাজটা খিটখিটে হয়ে যায়। মায়ের ওপর রাগ ঝাড়ি, বাবার সাথে কথা বলি না, ছোট ভাই-বোনকে ধমক দিই। অথচ, এই মানুষগুলোই আমাদের সবচেয়ে আপন। বাইরের কেউ হয়তো তোমাকে বিপদে ফেলে পালাবে, কিন্তু দিনশেষে পরিবারের এই মানুষগুলোই তোমাকে আগলে রাখবে। তাই চলো, ঘরের ভেতরের কিছু আদবকেতা ঝালিয়ে নিই।
পরিবারের কিছু আদবকেতা :
১। ভেজা তোয়ালে বা ব্যবহৃত কাপড় বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখবে না। এটা শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও, এই একটা কাজের জন্য আম্মুর মেজাজ কতটা খারাপ হয়, তা কল্পনাও করতে পারবে না। গোসল করে এসে ভেজা তোয়ালে বা কাপড় বিছানায় ছুঁড়ে মারবে না। নির্দিষ্ট স্থানে মেলে দাও। নিজের ব্যবহার করা নোংরা মোজা বা কাপড়গুলো সোফার চিপায় বা ফ্লোরে না ফেলে লন্ড্রি বাস্কেটে রাখো। নিজের কাজ নিজে করা স্মার্টনেস, মা-কে কাজের লোক ভাবা স্মার্টনেস নয়।
২। খাবার খেতে বসার আগে অবশ্যই হাত ধুয়ে নেবে। খাওয়ার সময় ফোন বা টিভি দেখবে না। পরিবারের সবার সাথে বসে খাওয়ার চেষ্টা করবে, এতে বরকত বাড়ে। খাওয়ার সময় চপচপ শব্দ করবে না। আর হ্যাঁ, প্লেটে যতটুকু খাবার নিয়েছ, তার সবটুকু শেষ করবে। প্লেট চেটে খাওয়া এবং কোনো দানা নষ্ট না করা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ। রিযিক নষ্ট করা খুব বড় অন্যায়।
৩। কানে হেডফোন লাগিয়ে রিল দেখছো বা গেম খেলছো, ওপাশ থেকে মা বা বাবা ডাকছেন, আর তুমি শুনতেই পাওনি। অথবা শুনেও বিরক্ত হয়ে বলে উঠলে, “উফ! কী হয়েছে বলো?”—এই কাজটা কখনো করবে না ভাইয়া/আপু। তাঁরা ডাকলে সাথে সাথে ‘জি আব্বু’ বা ‘জি আম্মু’ বলে সাড়া দেবে। গেইম পজ করা যায়, কিন্তু মা-বাবার মনে কষ্ট দিলে সেটা ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।
৪। বাবা-মায়ের রুমে ঢোকার আগে নক করবে, সালাম দিবে বা অনুমতি নেবে। ঠিক যেমনটা তুমি চাও তোমার রুমে ঢোকার আগে তারা করুক। তাদের ব্যক্তিগত ফোন বা ডায়েরি অনুমতি ছাড়া ঘাঁটাঘাঁটি করবে না।
৫। নিজেদের পরিবারের ঝগড়া-ঝাটি, অভাব-অনটন বা কোনো গোপন সমস্যার কথা বন্ধুদের কাছে বা আত্মীয়দের কাছে বলে বেড়াবে না। নিজের পরিবারের সম্মান রক্ষা করা তোমার দায়িত্ব। মনে রেখো, বাইরের মানুষ শুনলে শুধু মজাই নেবে, সমাধান দেবে না।
৬। ছোট ভাই বা বোনের সাথে সব সময় রিমোট, মোবাইল বা খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করবে না। তুমি বড়, তোমার দায়িত্ব স্যাক্রিফাইস করা। তুমি যদি ওদের ধমক দিয়ে কথা বলো, ওরাও তোমার কাছ থেকে সেটাই শিখবে। ওদের কাছে নিজেকে হিরো হিসেবে উপস্থাপন করো, ভিলেন হিসেবে না।
৭। খুব রাগ হয়েছে? দড়াম করে দরজা বন্ধ করবে না বা জিনিসের ওপর রাগ ঝাড়বে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “সে প্রকৃত বীর নয় যে কুস্তিতে কাউকে হারিয়ে দেয়, বরং সেই প্রকৃত বীর যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।” (সহীহ বুখারি: ৬১১৪, সহীহ মুসলিম: ৬৮০৯)
৮। ছেলে হয়েছো বলে কি ঘরের কাজ করা যাবে না? নিজের বিছানাটা গুছিয়ে রাখা, খাওয়ার পর নিজের প্লেটটা ধুয়ে রাখা, বা রুম থেকে বেরিয়ে গেলে ফ্যান-লাইট বন্ধ রাখা, এগুলো তোমারও দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজের কাজ নিজ হাতে করতেন, ঘর ঝাড়ু দিতেন, কাপড় সেলাই করতেন। ঘরের কাজে সহায়তা করলে পুরুষত্ব কমে না, বরং ব্যক্তিত্ব বাড়ে।
৯। বাসায় যদি দাদা-দাদি বা নানা-নানি থাকেন, তবে দিনের কিছুটা সময় তাঁদের পাশে বসো। তাঁদের গল্প মন দিয়ে শোনো, যদিও তা তুমি আগেও অনেকবার শুনেছ। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ খুব একা হয়ে যায়, তোমার একটু সঙ্গ তাঁদের কাছে অনেক দামি।
১০। রাত জেগে অহেতুক চ্যাটিং বা স্ক্রলিং করবে না। এতে শরীর ও মন দুটোই নষ্ট হয়। ফজরের সালাত মিস হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি ঘুমানো এবং ভোরে ওঠা সফল মানুষদের অন্যতম অভ্যাস।
আজ এই পর্যন্তই। নিজেকে পাল্টানো কঠিন, জানি। কিন্তু চেষ্টা করতে তো দোষ নেই! আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরিবারের চোখের মণি হয়ে থাকার তাওফিক দিন।
দেখা হবে পরের পর্বে, ইনশাআল্লাহ।
[চলবে ইনশাআল্লাহ…]
১. আগের পর্ব পড়ে নাও এখান থেকে – https://sholo.org/adobketa-02