এই রমাদানে নিজের লেভেল আপ করো

  • জুবায়ের আল মাহমুদ

আল্লাহ কুরআনে বলেন, “…তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের প্রতি জুলুমকারী এবং কেউ মধ্যমপন্থা অবলম্বনকারী। আবার তাদের কেউ আল্লাহর নির্দেশক্রমে নেককাজে অগ্রগামী।” (সূরা ফাতির, ৩৫:৩২) 

‎রমাদানে রোজাদারদের ক্ষেত্রেও এই আয়াতটির প্রতিফলন দেখা যায়। এই তো, আর অল্প ক’টা দিন অপেক্ষার পালা৷ এরপরেই আমাদের সামনে এসে হাজির হবে তাকওয়া ও সংযমের মাস পবিত্র মাহে রমাদান। বাহ্যিক দৃষ্টিতে এ মাসটিতে সবাই একইভাবে রোজা রাখলেও আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিদানের দিক থেকে আমাদের রোজাগুলো ব্যক্তিভেদে একেক রকম হয়। ইমাম গাজ্জালি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, রোজার তিনটি স্তর বা লেভেল রয়েছে। এগুলো হলো: 

১. সাধারণ মানুষের রোজা

২. অভিজাত ব্যক্তিদের রোজা

৩. বিশেষভাবে অভিজাত ব্যক্তিদের রোজা

১ম লেভেল: সাধারণ মানুষের রোজা 

এটি হলো রোজার সবচেয়ে প্রাথমিক স্তর। কেবলমাত্র খাদ্য, পানাহার ও জৈবিক প্রয়োজন থেকে বিরত থাকলেই রোজার হক্ব আদায় হয়েছে বলে আমরা মনে করে থাকি। অথচ এই সময়েও অনেকেই গীবত, মিথ্যা, ঝগড়া, গালমন্দ ও অশ্লীলতা থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখতে পারে না। চোখ দিয়ে হারাম জিনিস দেখা, কান দিয়ে নিষিদ্ধ বিষয় শোনার ফলে হারাতে বসে রোজার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। কেবল কিছু সময় ক্ষুধার্ত থাকাই হয়ে যায় রোজার একমাত্র অর্থ।

রাসূল ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি সিয়ামরত অবস্থায় মিথ্যা কথা বলা ও এর উপর আমল করা ছেড়ে না দেয়, তার পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” (বুখারি)

তিনি ﷺ আরও বলেছেন: “অনেক রোজাদার আছে, রোজা রেখে তার প্রাপ্য হয় শুধু ক্ষুধা আর তৃষ্ণা। আর অনেক নামাজ আদায়কারী আছে, রাত জেগে তার প্রাপ্য হয় শুধু জেগে থাকার কষ্ট।” (ইবনু মাজাহ)

তাহলে এমন রোজার অর্থই বা কী, যেখানে মানুষ সাধারণত খাবার, পানীয় ইত্যাদির মতো হালাল প্রয়োজনগুলো থেকে বিরত থাকে, কিন্তু সারাদিন এমন সব কাজে লিপ্ত থাকে, যেগুলো হারাম?

গুনাহে লিপ্ত থেকে শুধু না খেয়ে থাকা রোজার মূল উদ্দেশ্য নয়। এটা সেই ব্যক্তির মতো, যে নিজের জন্য একটি ঘর বানাচ্ছে, অথচ একই সাথে পুরো শহরকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এটি নিছক শয়তানের ধোঁকা। এ ধরনের রোজা মারাত্মকভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও অপূর্ণাঙ্গ।

২য় লেভেল: অভিজাত ব্যক্তিদের রোজা

এ স্তরে শুধু খাওয়া-পানীয় থেকে বিরত থাকাই নয়, বরং চোখ, কান, জিহ্বা, হাত, পা-সহ অন্যান্য অঙ্গকেও পাপ থেকে বিরত রাখাকে বোঝানো হয়। সাহাবীদের কাছে এটাই ছিল রোজার মর্মার্থ।

জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলতেন, “যখন তুমি রোজা থাকবে তখন তোমার কান, চোখ ও জিহ্বাকে মিথ্যা কথা ও গুনাহ থেকে বিরত রাখবে। এবং কাউকে কষ্ট দেবে না। রোজা থাকাবস্থায় শান্ত এবং নম্র থাকবে। স্বাভাবিক অবস্থায় আর রোজা রাখাবস্থায় যেন তোমার চেহারা একই রকম না হয়।” (মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ) 

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “রোজা শুধু খাবার ও পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং রোজা হলো অসার কথা ও অশালীন কাজ থেকে বিরত থাকা।” (সহীহ ইবনু হিব্বান)

এই স্তরের মানুষেরা নিজেদের কথাবার্তাকে সীমিত করে, মন্দ কথা শোনা থেকে বিরত থাকে, দৃষ্টির হিফাজত করে, সকল প্রকার অবৈধ সম্পর্ক ছিন্ন করে, ইফতারে অপব্যয় ও অপচয় করে না, নারীরা পর্দাবৃত থাকে, আত্মীয়দের সাথে সুসম্পর্ক রাখে এবং অতিমাত্রায় মোবাইলের ব্যবহার থেকে সর্বদা দূরে থাকে। কারণ তারা রোজার প্রকৃত অর্থ বুঝতে সক্ষম হয়েছে। 

আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, “রোজা হলো এমন একটি ঢাল, যা ব্যক্তিকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে। তবে এই ঢালের সক্ষমতা নির্ভর করে একে সংরক্ষণের উপর। এবং মানুষের গুনাহ এই ঢালকে ফুটো করে দেয়।”

৩য় লেভেল: বিশেষভাবে অভিজাত ব্যক্তিদের রোজা

এটাই হলো নবী-রাসূল, সিদ্দিকীন এবং আল্লাহর নিকটবর্তী বান্দাদের স্তর। এ রোজায় শুধু শরীর নয় বরং হৃদয়ও রোজাবস্থায় থাকে। এ ধরনের মানুষের অন্তর পুরোপুরি আল্লাহর দিকে সন্নিবেশ করে এবং তাদের দুনিয়াবি চিন্তার পরিমাণ কমে যায়।
ইবাদতে তখনই পূর্ণতা আসে যখন হৃদয় পুরোপুরি আল্লাহর দিকে মনোযোগী হয়। এভাবে যে ব্যক্তি  রোজা রাখে, সে দুনিয়ায় এবং আখিরাতে সর্বোচ্চ প্রতিদান লাভ করে।

প্রিয় ভাইয়া-আপু, রমাদান হলো আমাদের নিজেদেরকে বদলানোর সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। রমাদান শুরু হবার আর কয়েকটা দিন বাকি আছে৷ এই সুযোগ এখনো শেষ হয়নি। এই রমাদানে চলো নিজেদের লেভেল আপ করি। অভিজাত রোজাদারদের তালিকায় থাকার জন্য তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করি। 

[উস্তায আলী হাম্মুদার The 3 Levels of Fasting লেখা অবলম্বনে। মূল লেখার লিংক – https://tinyurl.com/2cn7bu9f]


Posted

in

by

Tags: