(১)
রোদ্দুর মাথায় নিয়ে এ-দোকান থেকে ও-দোকান ঘুরে বেড়াচ্ছে মুগ্ধ। সেই সাতসকালে বের হয়েছে। এখনো মনমতো একটা ইলেকট্রনিক পার্ট জোগাড় করতে পারেনি। পেটে খিদেয় ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। মুগ্ধ সেটাকে পাত্তা দিচ্ছে না। পকেটে আর মাত্র একশ আশি টাকা আছে। জিনিসটার দাম খুব বেশি হওয়ার কথা না, কিন্তু মেসে ফেরার জন্য অন্তত চল্লিশ টাকা ভাড়া বাবদ রাখতে হবে। আরও অনেকদিনের মতো আজকেও হয়তো দুপুরের খাবারটা বিসর্জন দিতে হবে। ছোট্ট করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুগ্ধ। তবে ওর দৌড়াদৌড়িতে একটুও বিরতি দেয় না। খুঁজতে খুঁজতে ঠিকই আসল জিনিসটা বের করে ফেলে সে।
– কত নিবেন, মামা?
– এক দাম দেড়শো।
– আরেকটু কমানো যায় না?
– না, এগুলা চাইনিজ মাল না। একদম অরিজিনাল।
আরও খানিকক্ষণ চাপাচাপি করে মুগ্ধ একশ বিশ টাকায় জিনিসটা কিনে নেয়। ওর মুখে এখন রাজ্যজয়ের হাসি। পকেটে আরও ষাট টাকা আছে। বাস ভাড়ার পয়সা সরিয়ে রেখে ও দুইটা সিংগারা কিনে নেয়, রাত পর্যন্ত এটুকুই সম্বল।
গত দুই মাস যাবৎ মুগ্ধ দিনরাত খাটছে। শুধু টিউশনি আর ইন্টারভিউয়ের সময়গুলো ছাড়া ওর জীবনে এখন একটাই লক্ষ্য। সায়েন্স কনটেস্টের জন্য প্রস্তুত হওয়া। মুগ্ধর চোখেই প্রথমে পড়ে একটা সায়েন্স কনটেস্টের বিজ্ঞাপন। বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি স্পন্সর করবে। বিরাট আয়োজন। প্রতিযোগিতা, কুইজ, ইন্টার্নশিপের সুযোগ – কী নেই! কনটেস্টের জন্য লিখিত আকারে প্রজেক্ট জমা নেওয়া শুরু হয়েছে। প্রতি দলে সর্বোচ্চ তিনজন প্রতিনিধি থাকতে পারবে। প্রথমে প্রজেক্টের সংক্ষিপ্ত বিবরণী আর একটা শর্ট প্রেজেন্টেশন, সেটায় শর্টলিস্টেড হলে, ফাইনাল রাউন্ডে বিচারকদের সামনে ডেমন্সট্রেশন আর ফাইনাল প্রেজেন্টেশন করতে হবে। বিজয়ী দল পাবে নগদ পাঁচ লক্ষ টাকা আর মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে এক বছরের পেইড ইন্টার্নশিপ। বলা বাহুল্য, এক বছর ভালো করে কাজ করলে চাকরিটা পুরোপুরি পার্মানেন্ট হয়ে যাবে।
এ প্রতিযোগিতার কথা বন্ধুদেরকে বলা মাত্রই ওরা ব্রেইনস্টর্মিং শুরু করে দেয়। তিন বন্ধু—মুগ্ধ, হাবিব আর সীমান্ত। আর এই প্রজেক্টের আইডিয়াটা প্রথমে সীমান্তর মাথা থেকেই বের হয়। ওর মাথায় সবসময় দারুণ সব আইডিয়া ঘুরঘুর করে। সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে খাবার ও পানীয় জীবাণুমুক্ত করা যায়, এমন একটা মেশিন বানাবে ওরা। মুগ্ধ আর হাবিব সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে যায়। দারুণ আইডিয়া! এই মেশিন বানাতে পারলে সত্যিই যুগান্তকারী একটা কাজ হবে! ওরা ওদের প্রজেক্টের নাম দেয়—প্রজেক্ট সৌরবন্ধু।
মুগ্ধ ভালো লিখতে পারে। ও আর দেরি না করে সে রাতেই প্রজেক্টের প্রোপোজাল ফাইল রেডি করে ফেলে, সেখানে ওদের চিন্তাটা সুন্দর করে সাজিয়ে লেখে। তবে এখনো সাবমিশন পোর্টাল খোলেনি। আরও কিছুদিন পর থেকে কনটেস্টের জন্য লিখিত আকারে প্রোপোজাল জমা নেওয়া হবে।
কনটেস্টে যোগ দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে তিন বন্ধুই কাজে লেগে পড়ে। প্রজেক্টটা ওদের সবার জন্য নেশায় পরিণত হয়েছে। যখনই সময় পাচ্ছে, কাজে লেগে যাচ্ছে। তিন বন্ধু একই মেসে থাকায় সুবিধা হয়েছে। আবার অসুবিধাও হয়েছে কম না। সারা বাসায় তার, সোলার প্যানেল, সার্কিট, আর স্ক্রু গড়াগড়ি খাচ্ছে। বুয়া এসে ক্রমাগত বিড়বিড় করছে। সে ঘরদোর ঝাড়পোছ করে দেয় আর একবেলা খাবার রান্না করে। আগেরদিন তারে পা বেধে বুয়া পড়ে গিয়েছিল। তিন বন্ধুর সায়েন্স প্রজেক্ট তার কাছে জঞ্জালের মতো মনে হয়।
“কুন পাগলের বাসায় যে আইয়া পড়লাম মা-গো-মা! ও মামা, আপনেরা এগুলান কী করেন?”
তিন বন্ধু বুয়ার কথা শুনে মাথা দুলিয়ে হাসে। সীমান্ত বলে, “খালা দেখবেন, আমরা এই সৌরবন্ধু বানাতে পারলে বড়লোক হয়ে যাব।”
বুয়া ওদের কথা ঠিক বিশ্বাস করে না। ঘর ঝাড়ু দিতে দিতে আবার বিড়বিড় করে।
(২)
দিন যায় দিন আসে। প্রতিদিন একটু একটু করে প্রজেক্ট সৌরবন্ধু গড়ে উঠছে। একটা প্রোটোটাইপ মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেছে। কম্পিউটারের স্ক্রিনে যখন সফটওয়ার সিমুলেশনে কাঙ্ক্ষিত ‘গ্রাফ’ ভেসে উঠল, হাবিব, সীমান্ত আর মুগ্ধ খুশিতে এমন চিৎকার দিল, কেউ শুনলে ভাববে যেন ওরা বিশ্বকাপ জিতেছে! সীমান্ত ছাদে উঠে ওর গার্লফ্রেন্ড তানিয়াকে ফোন দিয়ে “ইউরেকা” “ইউরেকা” বলে চেচাতে লাগল। ওর গার্লফ্রেন্ড এসব পাগলামো দেখে রাগ করে ফোন কেটে দিল। তাতে সীমান্ত মোটেও গা করল না। হাবিব খুশির চোটে লুঙ্গি পরেই একচোট নেচে নিলো। তাই দেখে বাকি দুজন হেসে গড়িয়ে পড়ল।
সফটওয়ার সিমুলেশনটা মোটামুটি ভালো রেজাল্ট দিলেও আরও অনেক কাজই বাকি। প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য সৌরবন্ধুকে হতে হবে আরও পারফেক্ট। হাবিব কোডিং সাইডটা দেখছে। কিছুতেই একটা জায়গায় মেলাতে পারছে না। কিন্তু এর মধ্যেই হাবিবের মা প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে গেল। গ্রাম থেকে ওর চাচাতো ভাই ফোনে জানিয়েছে। শুনে হাবিব সেদিন রাতেই গ্রামে চলে গেল।
হাবিব নেই, মুগ্ধ আর সীমান্তর উপর তাই চাপ বেড়ে যায়। দুইজন গাধার খাটুনি খেটে সৌরবন্ধুকে অনেকটাই এগিয়ে নেয়। সীমান্ত কোডিং এর ‘বাগ’টাও সলভ করে ফেলে। এখন মোটামুটি মানুষের সামনে নেওয়ার মতো অবস্থায় চলে এসেছে মেশিনটা। শুধু কিছু ঘষামাজা বাকি।
এর মধ্যে হাবিব গ্রাম থেকে ফিরল একরাশ দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে। তার মায়ের পেটে টিউমার ধরা পড়েছে, ভালো হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। কিন্তু হাতে পর্যাপ্ত টাকা নেই। ধারদেনা করে কিছু ওষুধপত্র কিনে রেখে এসেছে।
তিন বন্ধু একসাথে হওয়াতে কাজের গতি ফিরে এলো। সৌরবন্ধুর প্রোটোটাইপ প্রায় ফাইনাল স্টেইজে নিয়ে আসতে পারল। প্রুফ অফ কনসেপ্ট, ডিজাইন – সবকিছু ডান। এখন শুধু প্রেজেন্টেশন রেডি করা বাকি। সেটাও কঠিন কিছু হবে না। মেশিনটা যখন বেশ ভালো আউটপুট দেওয়া শুরু করল, হাবিব, মুগ্ধ আর সীমান্ত নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওরা তিনজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরল, যেন এতদিনের কষ্ট, রাতজাগা, ব্যর্থতা—সব এক নিমেষে সার্থক হয়ে গেছে।
হাবিব আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আম্মুর অপারেশনের টাকাটা মনে হচ্ছে এবার ম্যানেজ হয়ে যাবে রে!”
মুগ্ধও চোখে পানি নিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “প্রেজেন্টেশনের সময় আবার কেঁদে ফেলিস না বুদ্ধু!”
সীমান্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর মৃদু স্বরে বলে উঠল, “এই তো আমাদের শুরু…”
তিনজনের চোখের ভেতর তখন ঠিক মেশিনের ভেতরের বিশুদ্ধ পানির ফোঁটার মতোই জল চিকচিক করছে।
(৩)
প্রিলিমিনারি সাবমিশনের আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। মুগ্ধ, হাবিব আর সীমান্তর সবকিছু প্রস্তুত।
ওদের দৃঢ় বিশ্বাস ওদের প্রোপোজাল সিলেক্ট তো হবেই, ওরা প্রজেক্টটাও জিতবেই জিতবে। এই প্রথম না, ছোটবেলা থেকেই ওরা দেখেছে। যখনই স্কুলে সায়েন্স ফেয়ার হতো, ওদের টিম প্রথম নাহয় দ্বিতীয় হবেই। কলেজে থাকতে একবার সীমান্ত কী একটা আইডিয়া নিয়ে এলো, শুনে খুব হাস্যকর শোনাচ্ছিল। সায়েন্স ফেয়ারে সবার বাঘা বাঘা প্রজেক্টের মধ্যে ওদের তিনজনের প্রজেক্টটা দেখতে খুবই সামান্য মনে হচ্ছিল। কেউ যেন দাঁড়িয়ে দেখার আগ্রহও পাচ্ছিল না। অথচ সেবার ওরাই ফার্স্ট প্রাইজ পেল! আর কেউ না জানুক, সীমান্তর আইডিয়ার উপর মুগ্ধ আর হাবিবের পুরো আস্থা আছে। আর তাই তো সেই ছোটবেলা থেকেই বন্ধু ডাকলেই ওরা ছুটে একসাথে কাজ করতে নেমে যায়।
সময় বেশি নেই। ওরা তিনজন ঝালাই করে নিচ্ছে কীভাবে কী বলতে হবে, এর মধ্যেই কনটেস্টের আয়োজকদের থেকে একটা ইমেইল এলো।
আর্জেন্ট আপডেট।
সীমান্তই ইমেইলটা প্রথমে খেয়াল করল, জরুরি কিছু ভেবে জোরে জোরে পড়ে শোনাতে লাগল –
“Policy Update: Gender Inclusivity in All Teams
As part of our commitment to promoting gender inclusivity and fostering equal opportunities in STEM (Science, Technology, Engineering, and Mathematics), we are implementing a new requirement for all teams.
Each team must include at least one female member.
This change is intended to encourage greater participation of women in innovation and technology.”
বাংলা করলে এমন দাঁড়ায়-
“নীতি পরিবর্তন: সকল দলে নারী অন্তর্ভুক্তি
স্টেম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) ক্ষেত্রে লিঙ্গসমতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে আমরা একটি নতুন নিয়ম চালু করছি।
প্রতিটি দলে অন্তত একজন নারী সদস্য থাকা বাধ্যতামূলক।
এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো।”
ইমেইলের এই অংশটা পড়ে সীমান্ত নিজেই হতভম্ব হয়ে গেল। এক দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল।
ওর মাথা যেন কাজ করছে না, বোকার মতো প্রশ্ন করল, “কী বলল এসব?”
বাকি দুজনও যেন বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
হাবিব গলা নামিয়ে বলল, “লিঙ্গ সমতা… লিঙ্গ সমতার জন্য প্রতি টিমে অন্তত একজন মেয়ে মেম্বার থাকতে হবে। কিন্তু এখন আমরা কী করব?”
মুগ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “নারীদের জায়গা করে দিতে গেলে, আমাদের একজনকে জায়গা ছাড়তে হবে। আর আবার কি।”
হাবিবও চোখমুখ কালো করে বলল, “সেটাই, এক টিমে তিনজনের বেশিও তো থাকা যাবে না।”
তিন বন্ধু একেবারে নীরব হয়ে গেল। ওরা স্বচক্ষে নিজেদের স্বপ্নভঙ্গের দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে। ভার্সিটিতে থাকতে নারীদের সমান অধিকারের জন্য ওরাও অনেক আন্দোলন করেছে। আজ যে সেই বাস্তবতা এভাবে ওদের সামনে আসবে কল্পনাও করেনি। কেন যেন আজকের এই নিয়মটা ওরা মানতে পারছে না।
সীমান্ত এবার কথা বলে উঠল, “কোথাও কোনো গণ্ডগোল হচ্ছে। একটা সায়েন্স প্রতিযোগিতায় মেধা ছাড়া শুধু ‘মেয়ে’ হওয়ার কারণে কেউ কেন চান্স পাবে? এটা কি অন্যায় না?”
হাবিব বলল, “হান্ড্রেড পারসেন্ট অন্যায়। কাজ করলাম আমরা, এখন বলছে মেয়ে ঢুকাতে হবে। এটা কোনো কথা হলো?”
মুগ্ধ বলল, “কিন্তু এখন আমরা করবটা কী? টিমে মেয়ে ঢুকানো মানে তো আমাদের একজন বাদ হয়ে যাওয়া।”
ওরা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে শুরু করল। কেউ ভুলেও যে কথাটা উচ্চারণ করতে চাইছে না, অথচ মাথার ভেতর সবার একটা কথাই এখন ঘুরছে—অন্তত সে নিজে যেন টিমে থাকে। ছোটখাটো স্কুল-কলেজের প্রতিযোগিতা এটা না। লাখ লাখ টাকার প্রসঙ্গ, সাথে জব অফার, এত বড় সুযোগ জীবনে বারবার আসে না। তাছাড়া ওখানে বড় বড় অনেক বিজনেসম্যান আসবে। এদের কাউকে যদি ইমপ্রেস করা যায়, তাহলে প্রজেক্ট না জিতলেও একসাথে কাজ করার চান্স থাকবে। কে এই সোনালি সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়?
(৪)
দীর্ঘ বিরতির পর মুগ্ধ মুখ খুলল, ও যেন অন্যদের মন পড়তে পারছিল। ওর মনেরও যে একই অবস্থা!
মনের সমস্ত সাহস সঞ্চার করে আলতো স্বরে বলল, “দোস্ত, তোরা থাক। আমিই টিম থেকে রিজাইন করছি।”
“এটা কেমন কথা? তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।” সীমান্ত গলা চড়িয়ে বলল।
মুগ্ধ অনড়। শান্ত ভঙ্গীতে বলল, “তুই কি জানিস না আমাদের তিনজনের মধ্যে চাকরিটা সবচেয়ে বেশি দরকার এখন হাবিবের?”
“চাকরিটা তো তোরও দরকার, মুগ্ধ।”
“হ্যাঁ, কিন্তু এই চাকরি না পেলে আমার দিন আটকে থাকবে না। হাবিবের কাছ থেকে এই সুযোগ আমি কেড়ে নিতে পারব না।”
হাবিব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে শুধু শুনছে। ও জানে, মুগ্ধর প্রতিটা শব্দ শতভাগ নির্ভুল। ডাক্তার বলেছিল ওর মাকে অতিসত্বর হাসপাতালে ভর্তি করানো দরকার। কিন্তু নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে হাবিবের পক্ষে টিউশনের টাকা দিয়ে ঢাকা শহরে নিজের খরচ চালানোই কঠিন, সেখানে হাসপাতালের খরচ চালানোর প্রশ্নই আসে না।
এদিকে সীমান্তই যে সৌরবন্ধু প্রজেক্টের মূল কারিগর। ওকে বাদ দিলে যে কিছুই থাকে না!
কিন্তু মুগ্ধকে কীভাবে বাদ দেওয়া সম্ভব? এই কনটেস্টের কথা তো মুগ্ধই ওদেরকে জানিয়েছে। এমনকি প্রজেক্টের লিখিত প্রোপোজালটাও মুগ্ধর! গত তিনমাস বাকি দুজনের মতো মুগ্ধও সমানতালে খেটেছে। প্রোটোটাইপ দাঁড় করানোর পিছনে হাবিবের চেয়ে বরং মুগ্ধরই অবদান বেশি। এখন প্রোপোজাল সাবমিশনের সময় দেওয়া হয়েছে মাত্র দুই সপ্তাহ। এই দুই সপ্তাহের মধ্যে নতুন করে কোনো প্রজেক্ট রেডি করা অসম্ভব।
হাবিবের মাথা ঘুরছে এত কথা ভেবে। ও কী বলবে ভেবে পায় না।
সীমান্ত এবার শেষ চেষ্টা করল। মুগ্ধর হাত ধরে বলল, “দ্যাখ, এই সমস্যার সমাধান কী আমি জানি না। আমাদের সাথে যা হচ্ছে এটা আনফেয়ার কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তুই এভাবে টিম থেকে সরতে পারবি না। দরকার হলে আমরা ওদের বিপক্ষে জনমত গড়ে তুলব।”
মুগ্ধ ম্লান হাসে। “না দোস্ত, এখানে এসব করে লাভ হবে না। সবার শেষে বলাই আছে, কর্তৃপক্ষের নীতিমালা না মানলে সেই টিম বাতিল। তাছাড়া নারীদের সমঅধিকারের বিপক্ষে কথা বলে আমরা কিছুই করতে পারব না। সবাই আমাদেরকেই ভুল বুঝবে।”
বাকি দুই বন্ধু এবার মেনে নিল। কী করবে? ওরাও বুঝতে পারছে আসলেই কিছু করার নেই। আবার এটাও বুঝতে পারছে যে, ওদের বন্ধুর উপর ভীষণ অন্যায় হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই অন্যায়কে ঠেকানোর কোনো রাস্তাই ওদের কারও জানা নেই। হয় নিজের স্বপ্নকে বিসর্জন দিতে হবে। নাহয় যেকোনো একজনের উপর এই অন্যায়কেই মেনে নিতে হবে।
মুগ্ধ চুপচাপ মেস থেকে বেরিয়ে গেল। সীমান্ত আর হাবিব লজ্জায় আর অস্বস্তিতে তাকে কিছুই বলতে পারল না। হাবিব একবার ওর হাত ধরে বলল, “যাস না দোস্ত, সীমান্তও দরজার দিকে এগিয়ে এলো। কিন্তু মুগ্ধ জানতো এখানে ওর উপস্থিতি কারও জন্যই ভালো হবে না, ওর নিজের জন্যেও না।”
বের হয়ে সোজা চলে গেল টিউশনে, ছাত্রকে পড়া বুঝিয়ে দিলো। এদিকে ওর মাথায় চলছে গত তিনমাসের চিত্র। কী না করেছে ও সৌরবন্ধুকে তৈরি করার জন্য। নাওয়া-খাওয়া-ঘুম বাদ দিয়ে দিনরাত খাটাখাটনি করেছে। প্রজেক্টের বিভিন্ন পার্টস কিনতে দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছে। হয়তো টাকার হিসাবে সংখ্যাটা খুব বড় হবে না, কিন্তু ও জানে এটুকু টাকার জন্য ওকে কত কষ্ট করতে হয়েছে। টিউশন থেকে পাওয়া টাকা পর্যন্ত ও এই প্রজেক্টের পিছনে দিয়েছে। প্রজেক্টটা ছিল ওর স্বপ্ন। আজ নারী অধিকার নীতির জন্য ওর স্বপ্নটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
(৫)
মুগ্ধ সে রাতে আর মেসে ফিরল না। পরিচিত এক বড় ভাইয়ের মেসে কয়েকদিন কাটাল। তীব্র শোকের সময় মানুষের কোলাহল ভালো লাগে না। মুগ্ধ ঠিক করল তার জিনিসপত্র নিয়ে এসে নতুন কোনো মেসে উঠবে। খুঁজতে খুঁজতে একটা ঘর পেয়েও গেল। লাগোয়া অনেকগুলো ঘরের একটা ভাড়া হবে। ভাড়াও কম, সে একাই ঘরটায় উঠে যায়। পুরোনো মেস থেকে জিনিসপত্র আনতে গিয়ে দেখল, সীমান্ত আর হাবিব ফাইনাল প্রেজেন্টেশন প্র্যাকটিস করছে। বুঝতে পারল ওদের প্রোপোজাল একসেপ্টেড হয়েছে। সীমান্তর পাশে ওর গার্লফ্রেন্ড তানিয়াকেও দেখতে পেল। তানিয়া এখানে কী করছে মুগ্ধ ভেবে পেল না। মেয়েটা সারাদিন নিত্যনতুন মেইক-আপ করে আর ইন্সটাগ্রামে রীলস বানায়। কীভাবে সীমান্তর সাথে ওর বনিবনা হয় এটাই রহস্য। মুগ্ধ আর মাথা না ঘামিয়ে ওর মালামাল নিয়ে চলে এলো।
অবশ্য এর কয়েক মাস পর খবর দেখে বুঝতে পারল, এই তানিয়াই ওর জায়গাটা নিয়েছে। যে কিনা সায়েন্সের কিছুই বোঝে না। যার কিনা ওদের প্রজেক্টের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহও ছিল না। সীমান্ত আর হাবিবের সাথে এখন সেই তানিয়াই নারী মেম্বার হিসেবে কনটেস্টে যোগ দিয়েছে।
লাইভ অনুষ্ঠানের দিন কৌতূহল দমাতে না পেরে মুগ্ধ টিভির সামনে বসলো। এই প্রজেক্টের সাথে ওর অনেক কষ্ট আর ঘাম মিশে আছে, ওর স্বপ্ন ছিল প্রজেক্ট সৌরবন্ধু। এই প্রজেক্ট জেতা মানে মুগ্ধরও বিজয়। যদিও সেটা পৃথিবীর কেউই জানতে পারবে না।
মুগ্ধ সবিস্ময়ে দেখতে পেল সত্যি সত্যিই প্রজেক্ট সৌরবন্ধু জিতে গেছে! ওদের টিম জিতে গেছে! শুধু মুগ্ধ আর ওদের সাথে নেই। টিভিতে ওদের উল্লাস আর উচ্ছ্বসিত মুখগুলো দেখে মুগ্ধ আরও বিষণ্ণতায় ডুবে গেল।
ওর বন্ধুরা কত এগিয়ে গেছে। ভালো জব, সবার প্রশংসা আর সম্মানের পাত্র ওরা। এমনকি তানিয়াও বড় একটা কোম্পানিতে জব পেয়েছে, তেমন কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই! ও একটা মেয়ে, এটাই ওর যোগ্যতা।
খালি মুগ্ধর জায়গাটা হাতছাড়া হয়ে গেল। ও এখনো ইন্টারভিউ দিয়ে চলেছে। হয়তো কোনো একদিন চাকরি পেয়ে যাবে। হয়তো কোনো একদিন ওর ভাগ্যেও ভালো কিছু ঘটবে। কিন্তু সেই দিনটা কবে আসবে ও জানে না।
মুগ্ধ ওর ছোট্ট ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসে।
পিচঢালা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, কী অদ্ভুত নিয়ম, যেখানে মানুষের যোগ্যতার চেয়েও বেশি জরুরি নারী-পুরুষের সংখ্যা সমান রাখা! কী অযৌক্তিক চিন্তা, যেখানে সমতা আর অধিকারের নামে অন্যের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। কী মনগড়া নীতি, যেখানে কেউ না খেটেও সুযোগ পেয়ে যাবে, আর কেউ খেটেও সুযোগ পাবে না।
সমাজের চোখে মুগ্ধ একজন ব্যর্থ মানুষ।
কিন্তু এ সমাজের সিস্টেমটাই যে মুগ্ধর মতো মেধাবী ছাত্রকে সুযোগ দিতে ব্যর্থ, সে চিন্তাটা করার সময় যেন কারোরই নেই।
