ফেলটুস থেকে টপার (৬ষ্ঠ পর্ব)

ক্লাস সেভেন পর্যন্ত ভালো ছাত্র ছিলাম। এরপর কী যে হলো, সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেল। একের-পর-এক রেজাল্ট খারাপ হতে থাকল। ক্লাস নাইনের ফাইনাল পরীক্ষায় তিনটা সাবজেক্টে ফেইলই করে বসলাম। বাবা বলল আমাকে অটো কিনে দেবে… আর পড়াশোনা করাবে না। মা আমার পিঠে ঝাড়ু ভাঙ্গার আর পাশের বাড়ির মেহেদীর পা ধোয়া পানি খাওয়ানোর ইচ্ছা পোষণ করল। এ সময় আমার জন্য আল্লাহর রহমত হিসেবে হাজির হলো ফুপাতো ভাই হাসান। আমাকে বেশ কিছু টিপস দিলো সে। সেই টিপস ফলো করে এর পরের পরীক্ষাগুলোতে একের-পর-এক ছক্কা হাঁকাতে থাকলাম আমি। সেই টিপসগুলোই তোমাদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে শেয়ার করছি আমি। আগের পর্বগুলো না পড়ে থাকলে ষোলোর ওয়েবসাইট থেকে পড়ে নাও দ্রুত।[১]

এইটের জেএসসি’র পর ড্যাংড্যাং করে সায়েন্স নিয়ে নিলাম। দেখতাম নাইনে সায়েন্স না নিলে কেউ পাত্তা দেয় না, অন্য চোখে দেখে। তাই সমাজে মুখ রক্ষার জন্য নিয়ে নিলাম সায়েন্স। কিন্তু এর পরেই ঘটে গেল ট্রাজেডি। একেবারে অকুল দরিয়ায় পড়লাম। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, হায়ার ম্যাথ, বায়োলজি – এত এত সূত্র, এত এত সংজ্ঞা মনেই রাখতে পারছিলাম না। যে স্যারের কাছে কোচিং পড়তাম, তিনি বলতেন – বায়োলজি মুখস্থবিদ্যা, বুঝার কিছু নাই, লেডিস সাবজেক্ট। তার কথা শুনে হাসি পেলেও, মনে মনে বেশ ভয় হতো। আমি তো মুখস্থ করায় একদমই কাঁচা, এতকিছু মুখস্থ করব কীভাবে? এই ভয়ে আর টেনশনে সারা বছর বায়োলজির মুখ দেখিনি। তাই বার্ষিক পরীক্ষায় ফেইল করে বসলাম। 

পরে হাসান ভাই বুঝিয়ে বললেন, কোনো সাবজেক্টই শুধু মুখস্থ বিদ্যা নয়, বোঝার কিছু না কিছু আছে। আর সাবজেক্টের নারী-পুরুষ হয় না, লেডিস সাবজেক্ট বলে কিছু নাই। বায়োলজি সম্পর্কে এই ভুল ধারণাটা খুব প্রচলিত। তবে হ্যাঁ, বায়োলজিতে মুখস্থ করার মতো জিনিস অন্যান্য সাবজেক্টের তুলনায় বেশি, কিন্তু এখানে বোঝারও আছে অনেক কিছু। 

তো, পড়া মুখস্থ করার কিছু টোটকা হাসান ভাই শিখিয়ে দিয়েছিলেন। সেগুলোই আজ তোমাদের সাথে শেয়ার করব। টোটকাগুলো কাজ করেছিল একেবারে পাগলা মলমের মতো, এক ফাইলই যথেষ্ট। কমার্স ও আর্টসেও নিশ্চয়ই এমন কিছু হতচ্ছাড়া সাবজেক্ট আছে যেগুলোয় বেশি বেশি মুখস্থ করতে হয়। এই টোটকাগুলো সায়েন্স-কমার্স-আর্টস সবারই কাজে দেবে। বাদ যাবে না একটি শিশুও। 

টোটকা ১: ফ্ল্যাশ কার্ড (Flash Card)

নামটা শুনে কোনো খেলার মতো মনে হচ্ছে না? এই টেকনিকটাও অনেকটা খেলার মতোই। ধাপে ধাপে বলছি কী করতে হবে:

● প্রথমে একটা কাগজের টুকরো নাও। সহজ হয় যদি একটা পেইজকে ভাঁজ করে ৪ ভাগ করে নাও।

● এরপর টুকরোটার এক দিকে যে টপিকটার সংজ্ঞা মুখস্থ করতে চাইছো সেটার নাম লিখো। বা প্রশ্ন আকারেও লিখতে পারো। যেমন: ‘সালোকসংশ্লেষণ’, বা ‘সালোকসংশ্লেষণ কী?’

● উল্টো পিঠে সম্পূর্ণ সংজ্ঞাটি না লিখে কী-ওয়ার্ড বা সংজ্ঞাটির গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলো লিখো। 

● এভাবে প্রতিটা টপিকের ফ্ল্যাশ কার্ড তৈরি করো। যেমন: সালোকসংশ্লেষণ হলো একটি জৈবিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে উদ্ভিদ তার পাতায় সূর্যের আলো ও ক্লোরোফিলের উপস্থিতিতে বাতাসের কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) ও মূলের মাধ্যমে শোষিত পানির বিক্রিয়া ঘটিয়ে শর্করা ও অক্সিজেন উৎপন্ন করে। এখানে কী-ওয়ার্ডগুলো হলো: জৈবিক প্রক্রিয়া, সূর্যের আলো + ক্লোরোফিল উপস্থিত, CO₂ + H₂O বিক্রিয়া, শর্করা + O₂ উৎপন্ন।

● মুখস্থ করার সময় পুরো সংজ্ঞাটি মুখস্থ করবে। তবে কী-ওয়ার্ডগুলোয় গুরুত্ব দিবে, যাতে কী-ওয়ার্ডগুলো মাথায় আসলেই পুরো সংজ্ঞাটি মনে পড়ে যায়। 

● এভাবে ফ্ল্যাশ কার্ড দিয়ে নিজেকে টেস্ট করবে। যেগুলো ভালো পারছো, যেগুলো মোটামুটি পারছো এবং যেগুলো খুব একটা পারছো না – সেগুলো আলাদা আলাদা রাখো। এরপর যেগুলো কম পারো সেগুলো বেশি বেশি দেখবে ও টেস্ট করবে। যেগুলো মোটামুটি পারো সেগুলো একটু গ্যাপ দিয়ে ২/৩ দিন পর পর দেখবে। আর যেগুলো ভালো পারো সেগুলো সপ্তাহে ১ বার করে দেখবে।

টোটকা ২: নেমোনিক (Mnemonic)

নামটা একটু অদ্ভুত লাগতে পারে, তবে টেকনিকটা কিন্তু মজার। সহজে বললে, নেমোনিক মানে হলো ছন্দের মাধ্যমে বেশ কিছু জিনিস একসাথে মনে রাখা। অনেক সময় আমাদের কোনো কিছুর উপাদান, বৈশিষ্ট্য বা শ্রেণিবিন্যাস মনে রাখতে হয়। সেসব ক্ষেত্রে এই টোটকা দারুণ কাজে আসে। একটা উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবে। 

আমাদের শরীরের কোথাও কেটে গেলে বা আঘাত লাগলে সেখান থেকে রক্ত পড়া বন্ধ করতে হয়। মজার বিষয় হলো রক্ত নিজেই এই কাজটি করে, একে রক্ততঞ্চন বা রক্ত জমাট বাঁধানো বলে। এই কাজটি করার জন্য রক্তের মধ্যেই ১৩টি উপাদান আছে। এগুলোকে রক্ত জমাট বাঁধানোর ফ্যাক্টর বলে। রক্ত জমাট বাঁধানোর প্রধান ৪টি ফ্যাক্টর মনে রাখার জন্য একটি সুন্দর নেমোনিক আছে:

ফুল​​​ পড়ে​​​ টুপ​​                করে

↓​​​↓​​​↓​​​↓

             ফাইব্রিনোজেন​​      প্রোথ্রম্বিন​             টিস্যু থ্রম্বোপ্লাস্টিন​         ক্যালসিয়াম আয়ন (Ca2+)

এভাবে করে নিজে নিজে সুন্দর নেমোনিক বানিয়ে বিভিন্ন জিনিস সহজেই মনে রাখতে পারবে।

টোটকা ৩: ফাইনম্যান টেকনিক (Feynman Technique)

এটাও একটা মজার টেকনিক। কোনো টপিক তুমি বুঝেছ কিনা তা যাচাই করতে পারবে এই টেকনিকের মাধ্যমে। এখন তোমাকে টিচার বনে যেতে হবে। যে টপিকটা পড়েছ, সেটা এমন সহজ করে বলতে হবে, যেন ক্লাস থ্রি’র একটা বাচ্চাও বুঝতে পারে। এভাবে রুমের দরজা বন্ধ করে আওয়াজ করে করে টিচারের মতো করে বলবে। বাসায় ছোট ভাই-বোন থাকলে তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করতে পারো। এই টেকনিকের মূল ধারণা হলো: বিষয়টা তুমি নিজে যত ভালো বুঝবে, অন্যকে তত ভালো বুঝাতে পারবে। তাই তোমার শ্রোতা ছোট ভাই-বোন যদি বুঝতে না পারে, তাহলে সেটা তোমার ভুল। নিজে আরও ভালো করে বুঝতে হবে এবং আরও সহজ করে উপস্থাপন করতে হবে।

পড়া মুখস্থ করা নিয়ে এখন তাহলে আর কোনো টেনশন নাই। নো টেনশন, ডু ফুর্তি। পড়া মুখস্থ করে পরীক্ষায় একেবারে ফাটিয়ে দাও। কথা হবে পরের সংখ্যায়।


by

Tags: