বাংলা যেভাবে সোনার বাংলা হলো (৩য় পর্ব)

মুসলিম শাসনামলে বাংলার শিল্প ও কারুশিল্পের বিকাশ

– আব্দুল্লাহ আল রায়হান মাদানী

মধ্যযুগীয় বাংলার মুসলিম শাসকদের শাসনামলে শিল্প ও কারুশিল্পের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা ঘটে। বাংলার শিল্প ও কারুশিল্প একদিকে যেমন স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণে ভূমিকা পালন করেছিল, তেমনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছিল। এই সময়ে বাংলার বস্ত্রশিল্প, কুটিরশিল্প এবং স্থাপত্যশিল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।

বস্ত্রশিল্পের বিকাশ

মধ্যযুগে বাংলার বস্ত্রশিল্প ছিল বিশ্বের অন্যতম সেরা। বিশেষ করে বাংলার মসলিন কাপড় ছিল এতটাই বিখ্যাত যে, এটি রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু করে অভিজাত সমাজের পোশাকে পরিণত হয়েছিল। মসলিন মূলত এক ধরনের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কোমল সুতি কাপড়, যা বিশেষ কারিগরদের হাতে তৈরি হতো।

মসলিনের উৎপাদন শুরু হয় মুসলিম শাসনামলে। আর তখন এটি বাংলার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে গৌড়সহ কিছু এলাকায় মসলিন তৈরির কারিগররা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতেন। এই শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মসলিন তৈরির কৌশল শিখে আসছিলেন।

বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলায় সফরকালে মসলিনের খ্যাতি সম্পর্কে লিখেছেন। তিনি বলেন, “বাংলার মসলিন এতটাই সূক্ষ্ম ও মোলায়েম যে, এটি ব্যবহারকারীর কাছে নিজের ত্বকের মতো মনে হয় এবং এর তুলনা হয় না।”

বাংলার মসলিন কেবল দেশেই নয়, সারা বিশ্বের অভিজাত সমাজের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। রাজা-বাদশাহ, নবাব, এমনকি ইউরোপীয় ধনী ব্যক্তিরাও বাংলার মসলিন ব্যবহার করতেন। বাংলার বস্ত্রশিল্প শুধু মসলিনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, অন্যান্য উন্নতমানের সুতি ও রেশমি কাপড়ও এখানে তৈরি হতো, যা আন্তর্জাতিক বাজারে সমাদৃত ছিল।

কিন্তু দখলদার ব্রিটিশরা এসে মসলিন কারিগরদের উপর অধিক কাজ চাপিয়ে দেয়। কিন্তু মজুরি দিত খুবই কম। তাদেরকে এক বছরের কাজের মজুরি একসাথে দেওয়া হতো। কিন্তু কাপড়ের মান ব্রিটিশদের পছন্দ না হলে পুরো টাকা ফেরত দিয়ে দিতে হতো। এত কাজের চাপের সাথে তাল মিলিয়ে উঠতে না পেরে কারিগরদের মাথায় ঋণের বোঝা চাপে। তাছাড়া এসময় শিল্পবিপ্লবের ফলে কম দামে উৎপাদিত কাপড়ের চল বেড়ে যায়, যেগুলো কম খরচে কেনা যেত। ফলে বাজারে মসলিনের চাহিদা কমতে থাকে এবং লাভের মুখ না দেখায় কারিগররা মসলিন তৈরি ছেড়ে দেয়। এক পর্যায়ে এই সমৃদ্ধ শিল্প বিলুপ্ত হয়ে যায়।

কুটিরশিল্প ও কারুশিল্প

বাংলার কুটিরশিল্প ও কারুশিল্প মুসলিম শাসনামলে অসাধারণ সমৃদ্ধি লাভ করে। এই শিল্পে কাঠ, মাটি, রেশম, কাঁসা ও পিতলের মতো উপকরণ ব্যবহার করে নান্দনিক ও ব্যবহারিক পণ্য তৈরি করা হতো। বিশেষ করে কাঁসা ও পিতলের হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাসন এবং সজ্জাসামগ্রী তখনকার সময়ে ঘরে ঘরে ব্যবহৃত হতো এবং তা রাজপ্রাসাদ থেকে সাধারণ মানুষের ঘর পর্যন্ত সর্বত্র জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলার চিত্রকলা, মৃৎশিল্প, কাঠশিল্প ও ধাতুশিল্প আরও উন্নত মানে পৌঁছায়। দক্ষ শিল্পীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব শিল্পের নিখুঁত কৌশল রপ্ত করতেন।

বিশ্ববাণিজ্যের প্রসারের ফলে বাংলার কারুশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারেও বিশেষ স্থান করে নেয়। ফারসি, তুর্কি ও আরব বাণিজ্যকেন্দ্রে বাংলার তৈরি পণ্য ব্যাপকভাবে রপ্তানি হতো। বাংলার মসলিন কাপড়ের মতোই কাঁসা-পিতলের তৈজসপত্র, নকশা করা কাঠের আসবাবপত্র, এবং রৌপ্য-খচিত কারুকাজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়। বাংলার শিল্পীরা তাদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা দিয়ে শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, বিশ্ববাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন।

স্থাপত্যশিল্পের বিকাশ

মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্যশিল্প ছিল এক অনন্য ঐতিহ্য, যেখানে ইসলামী স্থাপত্যের গভীর প্রভাব দেখা যায়। মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় বহু অসাধারণ স্থাপত্যকীর্তি গড়ে ওঠে, যা আজও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।

বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলার স্থাপত্যশিল্পের এক অমর নিদর্শন। মসজিদটির গম্বুজ সংখ্যা ৭৭টি হলেও লোকমুখে প্রচলিত নামানুসারেই এর নামকরণ হয়েছে ষাট গম্বুজ মসজিদ। শক্তিশালী দেয়াল, বহু খিলান ও গম্বুজের সমন্বয়ে তৈরি এই মসজিদটি বাংলার নির্মাণশৈলীর উৎকর্ষ প্রকাশ করে। এটি সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের আমলে খান জাহান আলীর উদ্যোগে নির্মিত হয়। এবং এটি বিশ্বের অন্যতম সুন্দর মসজিদ হিসেবে পরিচিত।

গৌড় শহরের স্থাপত্যশিল্পও বাংলার মুসলিম শাসনের সৃজনশীলতার এক অনন্য নিদর্শন। এখানে নির্মিত মসজিদ, মাদরাসা এবং অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপত্য সেসময়ের উন্নত নির্মাণশৈলীর পরিচায়ক। বিশেষ করে গৌড়ের সুলতানি স্থাপত্য পশ্চিম এশিয়ার ইবেরিয়ান স্থাপত্যের সঙ্গে তুলনীয় এবং এটি বাংলার স্থাপত্য ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে।

মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্যশিল্পের অন্যতম বৃহৎ নিদর্শন হলো আদিনা মসজিদ। এটি মালদহ জেলার পান্ডুয়ায় অবস্থিত এবং বাংলার সবচেয়ে বড় মসজিদ হিসেবে পরিচিত। ১৪শ শতকে সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ এটি নির্মাণ করেন। মসজিদটি পারস্য ও মধ্য এশীয় স্থাপত্যরীতির সংমিশ্রণে তৈরি, যেখানে ধনুকাকৃতির খিলান, বিশাল খোলা উঠান এবং সুদৃশ্য খোদাই করা স্তম্ভ রয়েছে। আদিনা মসজিদের নকশা সামসময়িক বৃহৎ ইসলামী স্থাপত্য, বিশেষ করে দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের অনুকরণে তৈরি বলে ধারণা করা হয়।

এছাড়া পান্ডুয়া, টঙ্গী ও খাজনা মসজিদও মধ্যযুগীয় বাংলার স্থাপত্যশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এগুলো শুধু উপাসনালয় ছিল না, বরং বাংলার সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। এসব স্থাপনার নকশা, ইটের কারুকাজ এবং শৈল্পিক খোদাই আজও স্থাপত্যবিদদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।

বাংলার এই স্থাপত্য নিদর্শনগুলো শুধু নির্মাণশৈলীর দিক থেকেই নয়, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃত।

আজ এই পর্যন্তই। ইনশাআল্লাহ, আমরা পরের পর্বে সমৃদ্ধ বাংলার অন্য কোনো দিক নিয়ে কথা বলব। আল্লাহ হাফেজ। 

সহায়ক গ্রন্থসমূহ:

১. K.N. Chaudhuri, The Trading World of Asia and the English East India Company 1660–1760, Cambridge University Press, 1978. 

২. Hameeda Hossain, The Company Weavers of Bengal: The East India Company and the Organization of Textile Production in Bengal 1750–1813, Oxford University Press, 1988.

৩. Rila Mukherjee, Meechants and Companies in Bengal: Kasimbazar and Jugdia in the Eighteenth Century, Primus Books, 2017.

৪ Abdul Karim, Dacca: The Mughal Capital, Asiatic Society of Bangladesh, 1964.

৫. Perween Hasan, Sultans and Mosques: The Early Muslim Architecture of Bangladesh, I.B. Tauris, 2007.

৬. Nazimuddin Ahmed, Islamic Heritage of Bangladesh, Bangladesh National Museum, 1984. 


by

Tags: