নীরব ঘাতক (১ম পর্ব)

৭ই নভেম্বর। রাত ১২টা। 

রায়হান অফিস থেকে বের হলো। আজ বড্ড দেরি হয়ে গেছে তার। শুধু মতিন সাহেবের জন্য। বিকেলে বস এসে মতিন সাহেবের ফাইল দেখে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন। ফাইলটা অনেক জরুরি। মতিন সাহেবকে কিছু কথা শুনিয়ে দিলেন। আর ফাইল সম্পন্ন করার গুরুদায়িত্ব এসে পড়ল রায়হানের কাঁধে। জমা দিতে হবে আজই। কিন্তু সময় নেই। তবুও রায়হান স্বাচ্ছন্দেই গ্রহণ করল দায়িত্বটা। কারণ এই পিতৃতুল্য বসের কথা দীর্ঘ আট বছরে কখনো অমান্য করতে দেখা যায়নি রায়হানকে।

রায়হান গাড়ির খোঁজে হাঁটতে শুরু করল। জনশূন্য রাস্তা। যত্রতত্র কিছু কুকুর ছোটাছুটি করছে। আকাশ থেকে নেমে এসেছে কুয়াশার দল। আশপাশের দৃশ্য বেশ ঘোলাটে দেখাচ্ছে। এই কুয়াশার আস্তরণে গাড়ির হদিস পাওয়াই মুশকিল। শীতকাল এখনো শুরু হয়নি। হেমন্তের দু’চার দিন বাকি এখনো। এরই মধ্যে শীত ঢাকা শহরে জেঁকে বসেছে। কে জানে, শীতকাল হয়তো এসেও পড়েছে। রায়হান সেটা জানে না।

রাস্তার পাশের দোকানগুলো বন্ধ। যাত্রী ছাউনির নিচে কিছু ভিক্ষুক চাদর মুড়ে ঘুমোচ্ছে। যেন ঠান্ডার বালাই নেই তাদের। চারপাশে পিনপতন নীরবতা। হঠাৎ একটা কুকুর রায়হানের কাছে ছুটে এসে ঘেউ ঘেউ করতে লাগল। সেই ডাক রাতের নীরবতাকে ভেঙ্গে খানখান করে দিল। সে ভ্রুক্ষেপ না করে চলতে লাগল। হয়তো এই কনকনে শীতের রাতে তার উপস্থিতি কুকুরদের পছন্দ হয়নি। 

একটু এগোতেই রায়হান একটা সিএনজি পেয়ে গেল। এই হাড় কাঁপানো শীতের রাতে দ্বিগুণ ভাড়া চাইল ড্রাইভার। রায়হান ভাড়ার পরোয়া না করে উঠে বসল সিএনজিতে। ড্রাইভার রায়হানকে নিয়ে মোহাম্মদপুর থেকে ওয়াশপুর টাওয়ার অভিমুখে রওনা হলো। একটু তাড়ায় আছে রায়হান। কারণ, তার স্ত্রী ও পাঁচ বছরের ছোট্ট ছেলে অপেক্ষা করছে তার জন্য। অফিসে কাজের চাপে আজ বের হতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।

কিছুক্ষণ পর সিএনজি তাকে নামিয়ে দিল ওয়াশপুর টাওয়ার। সেখান থেকে ৩০০ গজ দূরে মদিনা মসজিদের পেছনে ভাড়া বাসায় থাকে রায়হানরা। অন্যদিন এখান থেকে সে রিকশা করে যায়। কিন্তু শীতের দিন এত রাতে রিকশা পাওয়া দুষ্কর। তাই হেঁটেই কাজ চালাতে হবে আজ। ভাড়া চুকিয়ে সে বাসার পথ ধরল। সর্বত্র কুয়াশা ভিড় জমিয়েছে। পথ জুড়ে দমবন্ধ নীরবতা। বাতাসে হিম হিম গন্ধ ছড়িয়ে আছে। দূরে একটা ল্যাম্পপোস্টের আলো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু কুয়াশার কারণে ল্যাম্পপোস্ট ঠিক কতদূরে বোঝা যাচ্ছে না। এমন নির্জন রাতে হাঁটতে বেশ ভালোই লাগে তার।

হঠাৎ কোথায় যেন শিয়াল ডেকে উঠল। রায়হান হেঁটে চলেছে রাস্তায়। একটু পর খেয়াল করল কেউ যেন তাকে ফলো করছে। রায়হান থেমে চারপাশ পরখ করে নিল একবার। কিন্তু এই কুয়াশার রাতে চোখে নাগাল পাওয়াই মুশকিল। সাতপাঁচ ভেবে সে আবার হাঁটতে শুরু করল। আবার যেন কেউ তার পেছন পেছন হেঁটে আসছে। সে পেছনে তাকালো। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। আবারও চলা শুরু করল। খানিক পর আবারো কারও হাঁটা অনুভব করল সে। এবার একজন নয় বরং কয়েকজনের অস্তিত্ব টের পেল। আবার পেছন ফিরল সে। কেউ নেই। রায়হান মনের ভুল ভেবে পথ চলতে চলতে মদিনা মসজিদের পেছনে পৌঁছল। সিড়ি ভেঙে চার তলায় উঠে বেল বাজালো সে। রেবেকা দরজা খুলে দিল। ভেতরে ঢুকতেই ছোট্ট রাহাত এসে জড়িয়ে ধরল তাকে।

“বাবা! সেই কখন থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। এত দেরি করলে কেন?” কণ্ঠে অভিমান মিশে আছে।

“স্যরি, বাবা! অনেক কাজ ছিল অফিসে।”

ঝটপট ডিনার সেরে রেবেকা ও রাহাতকে ঘুমোতে পাঠিয়ে দিল। তারপর ড্রয়িং রুমে এসে রায়হান  বুক শেলফে চোখ বুলাতে লাগল। সেখান থেকে তার পছন্দের গোয়েন্দা সিরিজের একটি বই বের করল। বইটা নিয়ে সে বেডরুমে চলে গেল। রেবেকা ও রাহাত ইতিমধ্যে ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে। সে বিছানায় শুয়ে পাশের টেবিল ল্যাম্পটি জ্বাললো। কিছুক্ষণ বই পড়ার পর ঘুমে চোখ ভারি হয়ে আসলো তার। বইটি টেবিলে রেখে ল্যাম্প বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ল রায়হান। 

হঠাৎ রাতে তেষ্টা তার ঘুম ভাঙিয়ে দিল। সে টেবিলে রাখা পানিভর্তি গ্লাসের দিকে হাত বাড়াতেই হাত বইয়ে গিয়ে পড়ল। তখনই হাতে উষ্ণ তরলের আর্দ্রতা অনুভব করল সে। 

“আহা! বইয়ে পানি পড়ল কীভাবে?”

পরক্ষণেই হাতটা নাকের কাছে এনে কেমন উৎকট গন্ধ পেল। দেরি না করে ল্যাম্পটা জ্বাললো সে।

তারপর যা দেখল তাতে ভয়ে আঁতকে উঠল রায়হান। সে যেটা পানি ভেবেছিল, তা পানি নয়, রক্ত! ব্ল্যাঙ্কেটের দিকে তাকিয়ে দেখল, সাদা ব্ল্যাঙ্কেটে অজস্র রক্তের ছিটেফোঁটা অশুভ এক বার্তার জানান দিচ্ছে, “ঘরে খারাপ কিছু ঘটে গেছে।”

সে ভয় ও অস্থিরতা নিয়ে পাশে তাকালো স্ত্রী-সন্তানকে দেখতে। তারা বিছানায় নেই! ছুটে গিয়ে সে বেডরুমের লাইট জ্বাললো। সে ছাড়া আর কেউ নেই বেডরুমে। 

হঠাৎ দেখল, বিছানার নিচে লোহার কি একটা যেন পড়ে আছে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সে। কাছে এসে ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল রায়হানের। রক্ত মাখা একটি বুলেট। বুলেটটা হাতে নিয়ে বুঝল, এটা একটা ওয়ালথার বুলেট।

তারপর দরজার সামনে রক্ত দেখে তার চোখে অন্ধকার নেমে এলো। কী হচ্ছে এসব? সে কি স্বপ্ন দেখছে নাকি বাস্তব এসব? 

অদৃশ্য এক আতঙ্কে শরীর কাঁপতে লাগল রায়হানের। রক্তের দাগ দেখে মনে হচ্ছে কাউকে মার্ডার করে মৃত দেহটা হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। 

বুলেট ফেলে দিয়ে রায়হান দরজার দিকে ছুটল। দেখল হিঁচড়ে যাওয়া রক্ত তার গেস্ট রুমে ঢুকে গেছে। তড়িঘড়ি করে বেডরুম থেকে একটা লাঠি আনলো। তার মন বলছে গেস্ট রুমে নিশ্চিত কেউ আছে।

সে পা টিপে টিপে সামনে এগিয়ে দরজায় কান লাগাল। ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ ভেসে আসে কিনা!

“আমাকে ছেড়ে দিন, আঙ্কেল। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন। আমি বাবার কাছে যাব।” কেউ কাঁদতে কাঁদতে বলছে।

কণ্ঠটা শুনেই রায়হান আঁতকে উঠল। মুহূর্তেই চোখের পাতায় ভেসে উঠল রাহাতের মিষ্টি মুখ। দ্রুত দরজা খুলল সে। এই রক্ত হিম করা দৃশ্যের জন্য প্রস্তুত ছিল না রায়হান। রেবেকার নিথর দেহ ফ্লোরে পড়ে আছে রক্তাক্ত অবস্থায়। চেহারা ও চুল রক্তে ভিজে আছে। চেহারা চেনার উপায় নেই।

দেখে বোঝা যাচ্ছে, কেউ লোহার কিছু দিয়ে মাথায় এলোপাথাড়ি আঘাত করে চেহারাটা থেঁতলে দিয়েছে। এই করুণ দৃশ্যে রায়হানের চোখ ছলছল করতে লাগল। কিন্তু চোখ পানিগুলোকে আটকাতে আর সক্ষম হবে না। কারণ, পরবর্তী দৃশ্য তার চোখের বাঁধ খুলে দিবে।

রায়হান সামনে তাকাল। কালো কাপড় দিয়ে মুখাবয়ব আবৃত এক লোক তার ছেলের মাথায় সাইলেন্সার লাগানো ওয়ালথার ধরে আছে। কে এই লোক? কী তার পরিচয়? সে কি রেবেকার মতো রাহাতকেও মেরে ফেলবে? আজই কি শেষ ‘বাবা’ ডাক শুনবে তার ছেলের মুখ থেকে? নিয়তির উপর বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে তার। চোখ ছাপিয়ে পানি নামতে শুরু করল। সাইলেন্সার লাগানো ওয়ালথারের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রায়হান।

– শাহ নেওয়াজ (শিক্ষার্থী, উচ্চতর আরবি ভাষা ও সাহিত্য)


Posted

in

by

Tags: